১৪ মাস বয়সে বাচ্চার পা বাঁকা ও দাঁত না ওঠা — স্বাভাবিক না সমস্যা? অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা ও করণীয়

 প্রিয় মা-বাবারা,

আমার সাথে আপনারা অনেকেই ইনবক্সে কিংবা গ্রুপে শেয়ার করেন—
"আমার বাচ্চার বয়স ১৪ মাস, এখনো দাঁত ওঠেনি, একা হাঁটতে পারে না, আর পায়ের গড়নটা একটু বাঁকা। এটা কি কোনো সমস্যার লক্ষণ?"

এই প্রশ্নটা খুবই কমন, এবং আমি বুঝি এই দুশ্চিন্তা একেক সময় কতটা গভীর হয়। প্রথমে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করি—প্রত্যেক শিশুর গ্রোথ এক রকম হয় না। তবে কিছু নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে, তার বাইরে গেলে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।


১। ১৪ মাস বয়সে হাঁটতে না পারা — স্বাভাবিক না সমস্যা?

  • বেশিরভাগ শিশু ১১–১৫ মাস বয়সের মধ্যে একা হাঁটতে শেখে।

  • কেউ কেউ ১৬–১৭ মাসেও হাঁটতে শেখে, কিন্তু ১৮ মাস পার হয়ে গেলে "delayed walking" ধরে নেওয়া হয়।

আপনার বাচ্চা যদি ধরে ধরে হাটে, তবে এটি ভালো লক্ষণ। কিন্তু যদি ১৪ মাসেও দাঁড়াতে না পারে, পা শক্ত না হয় — তবে শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।


২। পা বাঁকা কেন হয়?

শিশুদের হাঁটতে শেখার সময় পায়ের গড়ন অনেক সময় O-shape (বা বাঁকা) হয়ে থাকে। এই অবস্থাটিকে বলে Physiological Bowing — এটি ২ বছরের আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক বলে ধরা হয়।

তবে যদি বাঁকাটে অবস্থা বেশি হয়, বা বয়স ২ বছর পেরিয়েও ঠিক না হয়, বা ব্যথা করে — তখন এটি হতে পারে:

  • Rickets (ভিটামিন D ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি)

  • Genetic বা Metabolic Bone Disease

  • Blount Disease (একটি বিশেষ হাড়ের রোগ)


৩। দাঁত না ওঠার কারণ?

সাধারণত ৬ মাস বয়স থেকে শিশুদের দাঁত ওঠা শুরু হয়।
কিন্তু অনেক শিশুর দাঁত ওঠে ১২-১৪ মাসে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১৬ মাসেও।

যদি ১৪ মাসে দাঁতের কোনো লক্ষণ না থাকে, সঙ্গে দেহে দুর্বলতা, পা বাঁকা, দুর্বল দাঁড়ানো, সহজে অসুস্থ হওয়া থাকে — তবে এটিও রিকেটস-এর লক্ষণ হতে পারে।


রিকেটস: আজও আমাদের শিশুদের এক ভয়ানক চুপচাপ রোগ

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত ও গ্রামাঞ্চলের শিশুরা নিয়মিত সূর্যের আলো পায় না। উপরন্তু, ভিটামিন D বা ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার কম খাওয়ানোর কারণে অনেক শিশুই হাড় দুর্বলতা ও রিকেটসে আক্রান্ত হয়। এটি শুধু পা বাঁকা করে না, বরং ভবিষ্যতে হাড়ে ব্যথা, গ্রোথ কমে যাওয়া, এবং হাঁটার সমস্যা তৈরি করে।


আপনি কী করবেন এখন?

১. একজন শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ (Developmental Pediatrician) এবং শিশু হাড়ের চিকিৎসক (Pediatric Orthopedic Surgeon) দেখান।
২. রক্তে ভিটামিন D, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ALP লেভেল টেস্ট করুন।
৩. এক্সরে করলে বোঝা যাবে রিকেটস আছে কি না।


প্রতিকার:

  • ভিটামিন D সিরাপ বা ইনজেকশন

  • ক্যালসিয়াম সিরাপ (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)

  • প্রতিদিন সকালে ২০-৩০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকা

  • দুধ, ডিমের কুসুম, মাছ ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো


চিকিৎসা কোথায় পাবেন?

  • ঢাকা শিশু হাসপাতাল

  • বিএসএমএমইউ (শিশু ও হাড় বিভাগ)

  • আপনার এলাকার জেলা সদর হাসপাতাল

  • শিশু বিকাশ কেন্দ্র (সরকারি হাসপাতালে এখন অনেক জায়গায় আছে)


শেষ কথায়:

আপনার বাচ্চা আজ হয়তো একা হাঁটছে না, দাঁত উঠেনি, কিন্তু সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ উন্নত ও সুস্থ হতে পারে। দয়া করে বিষয়গুলো অবহেলা করবেন না। আজ অনেক অভিভাবকই এসব সমস্যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন কিন্তু ডাক্তার দেখাতে দেরি করেন। দেরি করলে চিকিৎসা কঠিন হয়।

আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন। হয়তো আপনার মতো কেউ আরেকজন বাবা-মায়ের ভয় দূর করতে পারবে। এই বিষয়ে আপনার প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করুন—পরবর্তী লেখায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।


ধন্যবাদান্তে,
ডাঃ মোঃ ইকরামুল ইসলাম
MBBS (Dhaka Medical College)
ECFMG Certified (USA)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গর্ভে শিশুর মাথায় পানি জমা (Hydrocephalus): কারণ, ঝুঁকি ও করণীয়

দ্রুত বীর্যপাত এবং অতিসংবেদনশীলতা: একজন তরুণের বাস্তব সমস্যা ও সমাধানের পথ বয়স ২১, চাকরি ও বিয়ের পরিকল্পনা—কিন্তু ভয় একটাই: বিয়ের পর কী হবে?

দীর্ঘদিন হস্তমৈথুনের প্রভাব, দ্রুত বীর্যপাত ও যৌন দুর্বলতা—সমাধান কীভাবে সম্ভব?