বেশি ভাজ পরা আর কম খাওয়ায় মেয়ে বাবু হয়? — বাস্তব সত্যতা ও অভিজ্ঞতা
প্রিয় পাঠক,
আজকের আলোচনার বিষয়:
"গর্ভাবস্থায় যদি কিছু খেতে না পারি বা শরীরে বেশি ভাজ পড়ে, তাহলে মেয়ে বাবু হয় — এটা কি সত্য? কারও কারও ক্ষেত্রে তো ছেলে বাবুও হয়, তাহলে আসলে কী সঠিক?"
আমি, ডাঃ মোঃ ইকরামুল ইসলাম, আজ আপনাদের সাথে এই প্রচলিত বিশ্বাসের পেছনের বাস্তবতা ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আলোচনা করবো।
চলুন, শুরু করা যাক!
প্রচলিত ধারণা:
অনেকের মুখে শুনি —
-
গর্ভাবস্থায় খাবারে অরুচি থাকলে,
-
শরীরে অতিরিক্ত ভাজ বা দুর্বলতা দেখা দিলে,
-
গায়ের রং একটু ফ্যাকাসে বা মলিন দেখালে,
তাহলে নাকি "মেয়ে সন্তান" হবে!
এই ধারণা বহুদিন ধরে গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরেও প্রচলিত। কিন্তু আসলে কি এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?
বাস্তবতা: বিজ্ঞান কী বলে?
না, গর্ভাবস্থায় খাবারের রুচি কম থাকা, শরীরে ভাজ পড়া বা দুর্বলতা — এগুলোর সাথে গর্ভে ছেলে বা মেয়ে শিশুর জন্মের সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।
এসব লক্ষণ মূলত হরমোনাল পরিবর্তন এবং গর্ভকালীন শারীরিক চাপের কারণে হয়। ছেলে হোক বা মেয়ে — উভয় ক্ষেত্রেই এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গর্ভধারণের প্রথম তিনমাসে অনেক মায়েদেরই খাবারে অরুচি, বমিভাব, দুর্বলতা দেখা দেয়। এটাকে বলে "Morning Sickness"।
এটা ছেলে বা মেয়ে সন্তানের উপর নির্ভর করে না, বরং মায়ের শরীর কিভাবে প্রেগন্যান্সি রিঅ্যাক্ট করছে তার উপর নির্ভর করে।
কার কার এমন হয়েছে, কিন্তু ছেলে বাবু হয়েছে?
অনেক মা মন্তব্য করেন:
-
"আমার প্রেগন্যান্সির সময় একদম কিছু খেতে পারতাম না, সারাদিন বমি করতাম। সবাই বলতো মেয়ে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলে বাবু হয়েছে!"
-
"শরীরে এত দুর্বল হয়ে গেছিলাম যে দাঁড়াতে কষ্ট হতো, সবাই মেয়ে বলছিল, কিন্তু সুন্দর একটা পুত্রসন্তান এসেছে।"
এ রকম হাজারো বাস্তব উদাহরণ আছে যেখানে সব ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তাহলে ছেলে-মেয়ে নির্ধারণ আসলে কীভাবে হয়?
ছেলে বা মেয়ে হওয়া নির্ভর করে শুধুমাত্র বিজ্ঞানসম্মত জেনেটিক কারণে।
-
পুরুষের শুক্রাণু (Sperm) দুই ধরনের হয় — X (মেয়ে) এবং Y (ছেলে) ক্রোমোজোমযুক্ত।
-
যদি ডিম্বাণুর সাথে X ক্রোমোজোমযুক্ত শুক্রাণু মিলিত হয়, তাহলে মেয়ে সন্তান হয়।
-
যদি Y ক্রোমোজোমযুক্ত শুক্রাণু মিলিত হয়, তাহলে ছেলে সন্তান হয়।
এখানে মা'র শরীরের খাবার খাওয়া, ভাজ পড়া বা রুচির কোনো সম্পর্ক নেই।
মজার কথা: কেন এই ধারণা ছড়িয়েছে?
আগে যখন আল্ট্রাসাউন্ড বা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না, তখন মানুষ শরীরের পরিবর্তন দেখে অনুমান করত।
তখনকার অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে কিছু 'টোটকা' চালু হয়ে গিয়েছিল, যেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
উপসংহার:
গর্ভাবস্থায় খাবারে অরুচি বা শরীরে বেশি ভাজ পড়া = মেয়ে হবে — এই ধারণা একদমই ভিত্তিহীন।
ছেলে বা মেয়ে সন্তান আসবে, তা নির্ভর করে ক্রোমোজোমের মিলনের উপর।
তাই গর্ভাবস্থার পরিবর্তনগুলিকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হোন। পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, এবং নিজের মনকে সুখী রাখুন।
পৃথিবীতে আসা প্রতিটি সন্তানই এক অমূল্য আশীর্বাদ — ছেলে হোক বা মেয়ে।
আপনাদের সুন্দর মাতৃত্বের যাত্রা শুভ হোক।
ধন্যবাদান্তে,
ডাঃ মোঃ ইকরামুল ইসলাম
MBBS (Dhaka Medical College Hospital)
ECFMG Certified (USA)
#গর্ভাবস্থা #মাতৃত্ব #ছেলেমেয়েনির্ধারণ #ডাঃইকরামুল

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন