মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া, ও পরবর্তী সমস্যা
প্রিয় পাঠক,
আজকের আলোচনার বিষয়টি এসেছে একজন নারীর সরাসরি উদ্বেগ থেকে, যার বয়স ৪৫ বছর। তিনি জানতে চেয়েছেন:
“এই বয়সে পিরিয়ড অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে গেলে গা-হাত-পা জ্বালা, শরীর দুর্বলতা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি কি স্বাভাবিক? এসব কিছুর পেছনে কি কোন বড় সমস্যা আছে?”
চলুন এ বিষয়ে একটু গভীরভাবে জানি, যেন শুধু একজন নয়, আমাদের সমাজের বহু নারীর এই প্রশ্নের উত্তর একসাথে পাওয়া যায়।
৪৫ বছরের পর নারীর দেহে ঘটে যাওয়া হরমোনাল পরিবর্তন
এই বয়সের আশেপাশে নারীরা প্রবেশ করেন Perimenopause এবং পরে Menopause নামক এক প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় পর্বে। এটি কোনো রোগ নয়, বরং একটি পর্যায়। তবে এর কিছু প্রভাব শরীরে নানা অস্বস্তির জন্ম দেয়, যা চিকিৎসার দাবি রাখে।
Menopause কী এবং কখন হয়?
-
Menopause হচ্ছে সেই অবস্থা, যখন ১২ মাস টানা পিরিয়ড না হলে ধরে নেওয়া হয় মাসিক চক্র স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
-
সাধারণত এটি ৪৫-৫৫ বছর বয়সের মধ্যে হয়ে থাকে।
-
তবে অনেকেই ৪০-এর আগেও বা পরে প্রবেশ করতে পারেন — যেটাকে বলে Early বা Late Menopause।
হরমোনাল পরিবর্তনের ফলে শরীরে কী কী উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
পিরিয়ড বন্ধ হওয়ার আগে ও পরে শরীর থেকে ধীরে ধীরে কমে যায় নারী হরমোন — ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন। এই হরমোনদ্বয়ের ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলে শরীরের নানা সিস্টেমে, যেমন:
1. স্নায়ুতন্ত্র:
-
মাথা ব্যথা
-
ঘন ঘন মুড চেঞ্জ
-
মন খারাপ বা ডিপ্রেশন
2. ত্বক ও সংবেদনশীলতা:
-
গা-হাত-পায়ে জ্বালাপোড়া বা পিন চুবানোর অনুভূতি (paresthesia)
-
শরীরে ঠান্ডা গরমের অনুভব
3. হার্ট ও রক্তচাপ:
-
হঠাৎ হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
-
নিম্ন রক্তচাপ বা মাথা ঘোরা
4. হাড় ও পেশি:
-
শরীর দুর্বল লাগা
-
সহজেই ব্যথা হওয়া
5. মাসিক চক্র:
-
অনিয়মিত পিরিয়ড
-
পিরিয়ড অনেকদিন না হওয়া বা হঠাৎ শুরু হওয়া
এই উপসর্গ গুলোর সমাধান কীভাবে সম্ভব?
প্রথম ধাপ: নিশ্চিত হওয়া এটি আসলেই মেনোপজ সংক্রান্ত কিনা
-
রক্তে FSH (Follicle Stimulating Hormone) এবং Estradiol পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়।
-
থাইরয়েড বা ডায়াবেটিস থেকেও অনুরূপ উপসর্গ হতে পারে, তাই TSH, HbA1c টেস্টও করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: চিকিৎসকের পরামর্শে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
-
পুষ্টিকর খাবার (দুধ, দই, বাদাম, মাছ)
-
নিয়মিত ব্যায়াম
-
পর্যাপ্ত ঘুম ও স্ট্রেস কমানো
-
ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা
তৃতীয় ধাপ: চিকিৎসা
-
চিকিৎসক প্রয়োজনে Hormone Replacement Therapy (HRT) দিতে পারেন। তবে সবসময় প্রয়োজন হয় না, এবং কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিও থাকে — তাই এটি শুরু করার আগে গাইনি বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের মতামত জরুরি।
শেষ কথা:
প্রিয় পাঠক, আপনি যদি বা আপনার আশেপাশের কেউ এরকম উপসর্গে ভুগে থাকেন — ভয় নয়, বরং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন। এটি জীবনচক্রের স্বাভাবিক অংশ। নিয়মিত ফলোআপ আর সঠিক জীবনযাত্রা আপনাকে রাখবে সুস্থ ও কর্মক্ষম।
সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।
ধন্যবাদান্তে,
ডাঃ মোঃ ইকরামুল ইসলাম
MBBS (Dhaka Medical College)
ECFMG Certified (USA)
আপনার অভিজ্ঞতা, মতামত বা প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করতে পারেন। আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক পোস্ট পেতে চোখ রাখুন আমার পাতায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন